মেডিটেশন কি ?
বিভিন্ন লোক বিভিন্ন ভাবে প্রায় ৫০০০ বছর ধরে এর অনেক সংজ্ঞা দিয়ে এসেছে। কিন্তু আমি অত্যন্ত সরল ভাবে বলবো যে শরীর, মন এবং আত্মাকে এক করার উপায় হচ্ছে মেডিটেশন। একে ধ্যান অথবা যোগ ও বলা হয়।
অনেক সময় ধরে অনেক ভাবে মেডিটেশন করেও কোন ফল হয়নি কেন?
হ্যাঁ। ঠিক কথাই বলেছ। এর উত্তরে আমার একটা প্রশ্ন হচ্ছে যে তুমি যদি অনেক সংজ্ঞা, অনেক পরিভাষা জেনে থাকো এবং অনেক নিয়ম নিষ্ঠার কথা পড়ে থাকো তাহলে কি তুমি সবগুলো একসাথে নিয়ে এর অভ্যাস করতে পারবে?
হয়তো পারতেও পারো। কিন্তু সুনিশ্চিত ভাবে তাতে তোমার আসল উদ্দেশ্য সফল হবে না। লাভ এইটুকুই হবে যে তুমিও অন্য লোকেদের মতো বিভিন্ন সংজ্ঞা, পরিভাষা, পদ্ধতি আরও লোকেদেরকে বলতে থাকবে। তবে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ফেলে যে তুমি কতদিন ধরে অভ্যাস করছ আর তাতে কতো লাভ পেয়েছ তাহলে জবাব দিতে খুবই দুঃখের সাথে হয় সত্যিটা বলবে যে ‘কিছুই তো পাইনি’ কিংবা বুক চাপড়ে নিরেট মিথ্যাটাই “অশ্বথামা হত ইতি গজ” করে বলবে যে ‘অনেক কিছুই পেয়েছি’ তবে ‘নিজের জীবনে কোন পার্থক্য পড়েনি’।
এর কারণ হচ্ছে যে অনেক পন্থা অবলম্বনে আত্মা পর্যন্ত পৌঁছানো মোটেই সম্ভব নয়। আরও বিশেষ কথা এই যে যতো তার্কিক ধারণার সাথে নিজেকে জড়াবে ততই তোমার সব একাগ্রতা নষ্ট হতে থাকবে। তোমাকে মাত্র একটা রাস্তা দিয়েই এগোতে হবে। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস বলেছেন – ‘যত মত তত পথ’। তা ঠিক। কিন্তু তোমাকে একটা মত আর একটাই পথ বেছে নিতে হবে। তবেই প্রাপ্তি হবে।
মেডিটেশন তো অনেক প্রকার – তাহলে কোনটা ভালো?
আমার মতে মন্ত্র মেডিটেশনই সবথেকে ভালো। একে অতীন্দ্রিয় ধ্যান কিম্বা ইংরেজিতে ‘ট্রান্সেন্ডেন্টাল মেডিটেশন’ ও বলা হয়। এর একমাত্র বিশেষত্ব হল যে এটা যে কোন বয়সে যে কেউ শুরু করতে পারে এবং নিশ্চিত ফল পেতে পারে। তবে ছোট বাচ্চাদেরকে এটা করার জন্যে চাপ দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। তবে তুমি যদি নিজে খুবই অভ্যস্ত হয়ে যাও তাহলে যখন তুমি মেডিটেশন করবে তখন তোমার আশেপাশে যারাই থাকবে তাদেরও লাভ হবে।
কোন্ মন্ত্র করবো?
মন্ত্র যে কোন হতে পারে। বিশেষ অর্থযুক্ত কিম্বা বিশেষ কোন অর্থ ছাড়া এবং যদি অর্থ থাকে তাহলে সেটা যেন শুভ অর্থ হয়। তবে মন্ত্র সবসময় সরল এবং ছোট হওয়া উচিত। এটা ধর্মীয় শাস্ত্র থেকে হতে পারে কিম্বা নিজের মনগড়া হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ –
“ওম নমঃ শিবায়”
“আল্লাহ হূ আকবর”
“Ma-ra-na-tha – (Come Lord Jesus)” অর্থাৎ “হে যীশু, তুমি এসো”
“सरबत दा भला” অর্থাৎ “সবার মঙ্গল হোক”
আবার মনগড়া হলে এরকমও হতে পারে –
“আমি শুদ্ধ”
“ I am pure”
“ मैं शुद्ध हूँ” ……… ইত্যাদি।
কিন্তু সবসময় মনে রাখবে যে মন্ত্র বা প্রার্থনাতে কক্ষনও যেন ঋণাত্মক শব্দ না থাকে। যেমন – “ আমায় দোষমুক্ত কর”। এখানে ‘দোষ’ শব্দটি ঋণাত্মক এবং যতই এটা বলতে থাকবে ততই চারিদিকে শুধু ‘দোষ’ দেখতে পাবে – তা সে নিজের হোক বা অন্যের। দুটোই অশুভ।
শুধু মেডিটেশন কেন? জীবনে সবসময় ঋণাত্মক শব্দগুলো এড়িয়ে চলবে।
মেডিটেশন কিভাবে করবো?
খুবই গভীরে যদি যেতে চাও আর তোমার মধ্যে যদি অতি অল্প ‘নাস্তিকতা’ থাকে তাহলে কোন অভিজ্ঞ ব্যাক্তির অধীনে থেকেই এটা করা ভালো।
এখানে ‘নাস্তিকতা’ মানে কিন্তু তার্কিক হয়াও বটে।
আর যদি তুমি অত্যন্ত ‘আস্তিক’ হও তাহলে একা যেখানে হোক একটা শান্ত নিরিবিলি জায়গায় বসে মেডিটেশন করতে পারবে।
এখানে ‘আস্তিক‘ মানে তোমার মধ্যে যুক্তি তর্ক না থাকা। ‘আমার এই মোবাইল ফোনটার মধ্যে আমার ভগবান বা কোন শুভ শক্তি আছে’ – মানে যে যাই বলুক না কেন আমার কাছে তা আছে। এই রকম বিশ্বাস থাকলে তুমি সবথেকে বড় ‘আস্তিক’।
আরাম করে একদম সোজা হয়ে বস। কিছুক্ষন ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস নাও আর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাস ছাড়ো। নেওয়ার আর ছাড়ার সময়কাল কিন্তু এক হওয়া চাই। এক্টু অভ্যেস করলেই হবে। এক মিনিট হয়তো করলে। তারপর মন্ত্রটা বলবে শুধু নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় – নেওয়ার সময় নয়।
কোন মন্ত্র ছাড়া যদি শুধু নিঃশ্বাসের ওপর মনকে কেন্দ্রীভূত কর তাহলেও ভালো মেডিটেশন হয়।
কতক্ষণ করতে হবে?
প্রথমে দু মিনিট এবং পরে বাড়াতে বাড়াতে ৩০ মিনিট পর্যন্তও যেতে পারো। যারা ফল পেতে আরম্ভ করেছে আমি দেখেছি তাদের মধ্যে অনেকে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মেডিটেশন করে। তবে তুমি সকালে কুড়ি মিনিট আর সন্ধ্যেতে কুড়ি মিনিট করলে নিজেই ফলটা বুঝতে পারবে।
এর পরে আমি বলবো মেডিটেশন করলে লাভ কি কি পাবে। ততক্ষণ পর্যন্ত শান্ত হয়ে নিজেকে বদলে ফেলার সংকল্প নিয়ে মেডিটেশন করতে থাকো। সব শুভ হোক।
