রাগ বা ক্রোধ কি করে সংবরণ করবো? ভাগ – ২
কোন ভাল কারণের জন্যেও তুমি যখন একটুখানি রাগ কর, তোমার মন কিন্তু তখন থেকেই ওই রাগের অনুভূতিটাকে অন্য অনেক জায়গায় অনেক ভাবে আরও অনেক বেশি করে দেখানোর জন্যে তৈরি হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘Anger Escalation’.

Recap:

ক্রোধ কাকে বলে?

ক্রোধ মানুষের অসন্তোষের এমন একটা অনুভূতি যা যতো বাড়তে থাকে ততই শরীর আর মনের সর্বনাশ করতে থাকে। 

ক্রোধ নিবারণের প্রস্তুতি –   

তোমার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। সেটা হোল এই যে –  যা কিছুই ঘটুক না কেন আমার সাথে, আমার আশে পাশে, আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে – রাজনৈতিক, সামাজিক বা অন্যকিছু, আমি কোন মতেই রাগ করবো না। গালি দিলেও না আর মারলেও না।

ক্রোধ নিবারণের প্রথম উপায়ঃ

১)       অল্প কথা বলা।

তারপর এই ব্লগেঃ-   

এর পর বলার আগে  আমি একটা বিশেষ কথা বলে নিই –  

সেটা হচ্ছে এই যে আমি নিজে যা কিছু করে ক্রোধ নিবারণ করেছি শুধু সেইগুলোই এখানে বলবো। তোমরা ইন্টারনেট এ হাজার রকমের উপায় পাবে। তার মধ্যে আমারগুলো কিছু হয়তো মিললেও মিলতে পারে। কিন্তু নিশ্চিত ভাবে সব মিলবে না। তাই বলি আমি যা বলছি সেগুলো আমার কাছে কিন্তু সম্পূর্ণ প্রমাণিত সত্য।

এবারে গীতা দিয়ে শুরু করা যাকঃ-   

ক্রোধ কোথা থেকে কিভাবে আসে আর তার পরে কি হয় ? এটা গীতাতে অর্জুন কে শ্রীকৃষ্ণ বলছে যে –

(গীতাঃ অধ্যায় – ২, শ্লোক ৬২-৬৩)

ध्यायतो विषयान्पुंस: सङ्गस्तेषूपजायते |

सङ्गात्सञ्जायते काम: कामात्क्रोधोऽभिजायते || ৬২|| 

क्रोधाद्भवति सम्मोह: सम्मोहात्स्मृतिविभ्रम: |

स्मृतिभ्रंशाद् बुद्धिनाशो बुद्धिनाशात्प्रणश्यति || ৬৩||

(ধ্যায়তঃ বিষয়ান্‌ পুন্স সঙ্গঃ তেষু উপজায়তে। সঙ্গাৎ সঞ্জায়তে কামঃ কামাৎ ক্রোধঃ অভিজায়তে।।ক্রোধাৎ ভবতি সম্মোহঃ সম্মোহাৎ স্মৃতি বিভ্রমঃ। স্মৃতিভ্রংশাৎ বুদ্ধিনাশো বুদ্ধিনাশাৎ প্রনশ্যতি।।)

অর্থাৎ - মানুষ যদি বিষয় আশয়ের সাথে জড়িত হয়ে যায় তাহলে তার থেকে আসক্তি হয়, আসক্তি থেকে কাম(ইচ্ছা), কাম থেকে ক্রোধ,

ক্রোধ থেকে মানসিক বৈকল্য আর মানসিক বৈকল্য থেকে স্মৃতি ভ্রম,

স্মৃতি ভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ, আর বুদ্ধিনাশ থেকে মানুষের পতন হয়।

এখানে ‘স্মৃতি ভ্রম‘ মানে সুস্থ চিন্তার ব্যাঘাত। আর ‘পতন’ হচ্ছে জীবন দুঃখময় হয়ে যাওয়া।  

আমরা বাংলাতে একটা শব্দ জানি – ‘ক্রোধান্ধ’ অর্থাৎ ক্রোধে অন্ধ হয়ে যাওয়া। মানে  কি ভাল কি খারাপ সেটা একেবারেই না বুঝতে পারা। এই ক্রোধের অবস্থায় মানুষ অনেক ভুল করে ফেলে। বরং এটা বলা একেবারে ঠিক হবে যে ক্রোধের সময় মানুষ কোন কিছুই ঠিক ভাবে করতে পারে না।  

এটা তো হল গীতার মতে জীবন প্রবাহের মানসিক দিক।

এবারে জেনে নাও যে  ক্রোধ হলে আসলে শরীরে সব চেয়ে বেশি ক্ষতি কোথায় হয় – লিভার।  

ক্রোধ হলে শরীরের সব থেকে বেশি ক্ষতি লিভারে হয়। আর এটা আমরা সবাই জানি যে মানুষের প্রায় পুরো শরীর লিভার বা যকৃৎ দ্বারা পরিচালিত হয়।

তার মানে গীতাতে যা লেখা আছে তা সম্পূর্ণ সত্য। ‘ক্রোধ থেকে পতন’।

আমি কিন্তু এর আগে বলেছি যে ইচ্ছা পূর্তি না হলে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস বাড়ে আর তা থেকেই ক্রোধ হয়। আর এই ইচ্ছে থেকেই আমাদের মধ্যে সব দোষের জন্ম হয় – শারীরিক আর মানসিক।

তাহলে ক্রোধ কে কম করতে হলে স্ট্রেস কম করতে হবে। আর স্ট্রেস কম করার উপায় আমি আগে বলেছি।

উহ্‌! তাহলে ক্রোধ কিভাবে দূর করবো?

এই দেখ! এই যে ‘উহ্‌’ টা করলে না, এটাই হচ্ছে স্ট্রেস। আর কিছুক্ষন যদি তুমি ধৈর্য ধরতে না পারো তাহলে তোমার রাগ হবে। এটা একেবারেই হতে দেবে না।

ঠিক আছে, এই মূল প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে আমি আরও কিছু বিশেষ একই ধরণের প্রশ্ন জুড়ে দিই এখানে যেগুলো অনেকে আমায় করতে থাকে। তারপর আমার কথা পুরোটা শুনলে সব প্রশ্নের উত্তর একসাথেই পেয়ে যাবে।

১) ক্রোধ নিবারণের সমস্ত উপায় চেষ্টা করছি, তবুও কিন্তু আমার মনে হয় যে আগের থেকে আমি আরও বেশি রেগে যাই। কেন?

২) আমি রাগ আর মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রনের ক্লাসে নিশ্বাসের ব্যায়াম আর প্রাণায়ামও করেছি, এখনও করি। কিন্তু এখন বাড়িতে সবাই বলে যে আমি নাকি আগের থেকে আরও তাড়াতাড়ি এবং ঘন ঘন রেগে যাই। আমার কোথায় কি ভুল হচ্ছে?

৩) আমি গুরুজীর আশ্রমে যাই, গুরুজীর কথা শুনি, অনেক সময় ধরে ধ্যান করি। ইন্টারনেট থেকে খুঁজে খুঁজে সব উপায় করি, আমি অন্যদেরকে উপায়গুলো করতে বলিও, কিন্তু কারোরই কিছু লাভ হচ্ছে না। এর কারণ কি?

৪) সবাই বলে “রাগের সময় এক থেকে দশ গুনবে কিম্বা ‘রাম রাম’ বলবে।“ মোটেও হয়না। রাগের সময় কিছুই তো মনে আসে না শুধু রাগ ছাড়া। তাহলে কি এই উপায়টা মিথ্যে, নাকি আমারই ভুল হয়ে যায়?

৫) আমি আমার রাগের কারণ আর রাগ হলে কি করতে ইচ্ছে করে সব কথা লিখতে থাকি ডাইরিতে – ‘এই হলে রাগ হয়, ওই হলে রাগ হয়, চড় মারতে, লাথি মারতে, মাথাটা ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছে করে’ ইত্যাদি সব লিখতে লিখতে এখন মনে হচ্ছে যে আমি যেন সবসময় রাগেরই মধ্যে থাকি। শুধু রাগ আর রাগ। এটা কি আমি বন্দ করে দেবো? আর কি কোন ভাল উপায় আছে?

আরও অনেক প্রশ্ন আছে কিন্তু আপাতত এই কটা দিয়েই শেষ করছি।

এবারে বলি যে মানসিক রোগের বিজ্ঞানীরা মানে বড় বড় সাইকোলজিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্টরা চরিত্র ভিত্তিক কিছু তথ্য বার করে আর তারই উপর ভিত্তি করে কিছু উপায় বলে। আর খুব বেশি খারাপ অবস্থাতে ওষুধও দেয়। ভাল কথা। মনোবিজ্ঞানে বা চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিভিন্ন কথা আছে যেগুলো প্রায় হয়তো সত্যি কিন্তু সব সময় ঠিক উপায় বা ঠিক ওষুধ এবং পথ্য বলা সম্ভব হয়ে উঠে না। যেমন –

ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া। সাধারণ কারণ দুটো – খাবার বা স্ট্রেস। এক ডাক্তার বলবে খাবার ঠিক কর – বেশি ওজন হলে কম খাওয়া, কম ওজন হলে বেশি খাওয়া। অন্য ডাক্তার বলবে মূল কারণ হচ্ছে স্ট্রেস। তাই স্ট্রেস এর ওষুধ এবং উপদেশ। আবার অন্য আর একজন ডাক্তার বলবে – দুটোই চালাতে হবে। স্ট্রেস এর প্রতিকার আর খাবার এর নিয়ম।

ইংরেজিতে এটাকে বলা হয় Multifactorial Causation – মানে একটা রোগের বিভিন্ন কারণ। তৃতীয় একটা কারণও থাকতে পারে – সেটা হচ্ছে বংশগত। মানে বাবা-মায়ের বংশে যদি কারোর এটা থাকে তাহলেও হতে পারে। তাহলে কোন্‌ ওষুধ বা উপায় ঠিকমতো কাজ করবে? শুধু তাই নয় – এটা একটা লুপ (loop) এ চলে আসে, যেমন – স্ট্রেস থেকে বেশি বা কম খাওয়া আর তার থেকে মোটা বা পাতলা হয়ে যাওয়া আবার এই মোটা পাতলা থেকে আবার স্ট্রেস হওয়া। মেডিকেল সাইন্স এখানে ফেল না হলেও রোগী কিন্তু সারে না। আমি অনেক কে  জানি। যারা জিম (GYM) যেতে আরম্ভ করে আর বেশি খায় – কারণ জিম গেলে তো খাবার একটু বেশিই খেতে হবে, তাই না? ব্যস্‌, তাহলে আর কথা কি? প্রাণায়াম আর মেডিটেশনও করে স্ট্রেস এর জন্যে। কিন্তু কিছুই লাভ হয়নি।  আবার যারা রোগা,পাতলা আর স্ট্রেস যুক্ত – তাদেরটা ঠিক উল্টো। কিছুতেই কিছু কাজ হয় না। বাজারে অনেক রকম জিনিষ চলছে – “আগে” কত মোটা আর “পরে” কত পাতলা হওয়ার ছবি লাগিয়ে বিজ্ঞাপন। আরে বাবা! ওগুলো   সব মিথ্যে। কমপিউটারে বসে ওগুলো সব করা হয় আর যার ছবি সে পয়সা ও ভালো পায় বিজ্ঞাপন কোম্পানি থেকে।

ক্রোধের ব্যাপার ও ঠিক তাই। বরং আরও বেশি। নিজের অভ্যেস মানে মানসিকতা, বংশগত মানসিকতা, বর্তমান স্ট্রেস, খাওয়া-দাওয়া, সামজিক দিক – সব মিলিয়ে ক্রোধ হলে কিসের বা ওষুধ খাবে আর কি কি উপায় বা করবে?

নানান্‌ উপায়? ভুল ব্যায়াম? ভুল প্রাণায়াম? ভুল ধ্যান বা মেডিটশন? এক থেকে দশ? রাম রাম? ডাইরি লেখা?

কিছুই কাজ করবে না। করছেও না। ঠিক পথে এগিয়ে সঠিক উপায় যারা করছে শুধু তারাই স্ট্রেস আর ক্রোধ কে জয় করছে। বাকিরা এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে আরও রাগ বাড়াচ্ছে।

তাহলে সঠিক উপায় কি?

সঠিক বা বেঠিক তা আমি বলবো না, কিন্তুআমি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছি যে আমি এই  সহজ উপায়গুলো করে আমার রাগ বা ক্রোধ কে নিয়ন্ত্রন করেছি  আর অনেকেই এগুলো করে লাভ পাচ্ছে। এবারে সেগুলোই বলবো। শুধু কোন একটা বা দুটো করলে কিন্তু হবে না। সব একসাথেই করতে হবে। তবেই ফল পাবে।

১) অল্প কথা বল যত কম কথা বলবে ততই ক্রোধ কম হবে। এই অভ্যেসটা শুরু করতে হলে খাবার টেবিলে মৌন থেকে শুরু কর। আর যারা একা থাক বা একা খাও তারা মোবাইল ফোনে কথা বলার সময় বা কোথাও কোন কথা আলোচনা করার সময় এই অভ্যেস টা কর। আর সারা দিন যে কোন কথা বলার আগে মুখে আঙ্গুল দিয়ে প্রথমে থেমে যাও তারপর ভেবেচিন্তে বল। প্রথম প্রথম একটু খারাপ লাগবে। মনে হবে যে অনেক সময় নিয়ে বলছ। কিন্তু পরে পরে একদম ঠিক হয়ে যাবে।

২)  স্মিত হাসি  অভ্যেস কর – সব সময় – কারণে এবং অকারণে। আর ওই হাসি মুখে রেখে ভাবতে থাক কোন্‌ ‌ কোন্‌ অবস্থায় বা কথাতে তোমার রাগ হয়। তুমি কি সেগুলোকে সত্যি সামলাতে পারবে?

সবসময় মনে রাখবে যে ওই রাগের কথা গুলো ভাবার সময়ও তোমার মুখ থেকে স্মিত হাসি যেন চলে না যায়। হাসি চলে গেলেই সব নষ্ট।

এইটা অভ্যেস করতে করতে যেদিন তোমার বাড়ির লোকেরা কিম্বা বন্ধুরা তোমায় পাগল বলবে সেই দিনই তোমার সফলতার প্রথম দিন হবে। 

৩) KYC কর – ব্যাঙ্কে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলতে  গেলে ‘কে ওয়াই সি’(KYC) করতে বলে। তার মানে হচ্ছে Know Your Customer মানে ‘কাস্টমার কে জানো’। ব্যাঙ্ক জানতে চায় তুমি কে। কোথায় থাক ইত্যাদি। তাই আধার কার্ড আর প্যান কার্ড চায়। আমার এখানে ‘কে ওয়াই সি’(KYC) মানে হচ্ছে যে Know Yourself Completely মানে ‘তুমি নিজেকে পুরোপুরি জানো’। আর এটা যদি একটুও কম থেকে যায় তাহলে কিন্তু রাগ বা ক্রোধ কে দমন করা সম্ভব হবে না।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি এবং আমি মাঝে মাঝেই বলতে থাকবো যে –

যা ইচ্ছে তাই কর, কিন্তু কোন কিছুরই আবেশে এসো না।

‘আবেশ’ কে ইংরেজিতে বলে – Obsession (অবসেসন) – এটা একটা রোগ কে জন্ম দেয় যাকে বলে  OCD (Obsessive Compulsive Disorder), আর এটা কিন্তু রাগ বা ক্রোধের এক বিশেষ কারণ।

অবসেসন

কারোর কাছ থেকে কেউ শুনলো এই লোকটা খারাপ – সব সময় মনের ভেতর কোন কিছু না যাচাই করে পুষতে থাকলো ওই ধারণাটা যে ‘এই লোকটা খারাপ’। আবার উল্টো টা – কেউ বলল যে ওই লোকটা খুব ভালো আর তখন থেকে মনে ঢুকিয়ে নিল ‘ওই লোকটা খুব ভালো’। যখন অন্য কেউ এসে উল্টো টা বলবে তখন সে হবে রেগে লাল।

তার মনে হবে – ‘বলে কি? আমি কি মূর্খ নাকি – কিছু বুঝি না নাকি - আমি ওর চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবো। আমি প্রমাণ করে দেবো যে ও ভুল বলেছে।‘  আর এই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার প্রবণতাটা কিন্তু রাগ বা ক্রোধ নিবারণের ক্ষেত্রে ভীষণ ভয়ঙ্কর।

রাজনীতি তে সমর্থকেরা এইভাবে চায়ের দোকানে, হোটেলে, ট্রেনে-স্টেশনে, বাসে-বাস স্ট্যান্ডে এবং আরও বহু  জায়গায় বসে বা দাঁড়িয়ে ক্রোধ কে জন্ম দেয়। আর নিজের ভেতরে পুষে রাখে।

ওরা যা টীভিতে দেখে খবেরের কাগজে পড়ে সেটা ‘বেদবাক্য’ মনে করে রক্তের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। বহু শিক্ষিত-অশিক্ষিত এখানে কিন্তু সব এক। সব ওসিডি(OCD)র অধীনে।

তুমি কি কাউকে বোঝাবে নাকি? সাবধান! বলতে গেলেই ঝগড়া হবে, মারতেও আসতে পারে। তাই তুমি শুধু নিজেকে ঠিক কর অন্যের কথা থাক। তুমি অমৃত বাঁটতে চাও – আমি বুঝতে পারছি – কিন্তু ভাই, কলশী ভরা তীব্র বিষের মধ্যে তোমার এক ফোঁটা অমৃত যে কিছু কাজ করবে না। তাই ওটা খুব অল্প মৃদু বিষের জন্যেই রেখে দাও।

এবারে বলি কে-ওয়াই-সি (KYC) করবে কি করে।

তুমি নিজেকে জিজ্ঞেস করতে থাক – তুমি কোন্‌ কাজ কি ভাবে কর, কিভাবে অন্যদের সাথে কথা বল – নিজের খুব আপনজনের সাথে যে ভাবে ব্যাবহার কর ঠিক সেই ভাবে কি তুমি প্রতিবেশী বা অচেনাদের সাথে ব্যাবহার কর? যে ব্যাবহার তোমার ভালো লাগে না সেই ব্যাবহার কি তুমি অন্যদের সাথে কর?  কোন বিষয়ের ওপর নিজের সম্পূর্ণ জ্ঞান না থাকা সত্যেও কি তুমি অন্যকে সেই ব্যাপারে জ্ঞান দিতে চেষ্টা কর?ভারতে আজকাল আমি দেখি সবাই মাস্টার, সবাই ডাক্তার, সবাই উকিল – উচিত শিক্ষা ছাড়াই। সবাই যেন সব জানে। যারা আসলে ডাক্তার বা উকিল তারা কিন্তু বিনে পয়সায় একটা কথাও বলে না – কারণ তারা তাদের জ্ঞানের মূল্য বোঝে আর বাকিরা যারা সাধারণ লোক তারা দেখি উপদেশ আর তর্ক বিতর্কে যেন সর্বশ্রেষ্ঠ।

এটা কিন্তু তুমি একেবারেই করবে না। আর জ্ঞানকে সবসময় যাচাই করবে।  

কোন্‌ কথা যা দরকার না থাকলেও তুমি বলতে থাক? সারাদিনের মধ্যে কত অদরকারী কথা তুমি বলতে থাক যা তোমার মনে হয় যে সেগুলো সব দরকারি কথা। যেমন – ওইটা ও না করলে ভালো হত। ‘যদি এরকম হত তাহলে ওইটা হত না বা হত’।   এই ‘যদিগুলো’ কিন্তু সবই অদরকারী। তাই এগুলো কক্ষনও বলবে না।

ওপরের গুলো সব যদি অভ্যেস করতে থাক তাহলে তুমি নিজের দোষ নিজেই খুঁজে পাবে।

জ্ঞান আর অজ্ঞানের প্রসঙ্গে বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক  সক্রেটিস  এক জায়গায় বলেছিল যে –

“আমি সবচেয়ে জ্ঞানী জীবিত এক মানুষ, কারণ আমি একটি জিনিস জানি, আর তা হল এই যে আমি কিছুই জানি না।“   

সবজান্তা লোকেদের বর্তমান এই সমাজে এটা সবসময় মনে রাখবে আর এর ভেতরের অর্থ বোঝার চেষ্টা করবে। তাহলে উন্নত চরিত্র পেতে বেশি সময় লাগবে না।

৪) সব সময় নিজের মধ্যে সুখের অনুভূতি রাখবে –     

ওই যে স্মিত হাসি তোমার মুখে – ওটাই তোমায় সাহায্য করবে সুখের অনুভূতি দেওয়ার। যা কিছুই হোক না কেন ওই হাসি আর এই অনুভূতি যেন না যায়। পুলিস গাড়ি ধরল সিগন্যালটা ঠিক দেখতে পাওনি বলে পেরিয়ে এসেছ। জরিমানা করে দিল পুলিস। তোমার হাসি আর অনুভূতি কিন্তু যেন না যায়।

কি পাগলের মতো কথা! রাগ তো একটু হবেই। অনেকে যে বলে রাগের একটা ভালো দিক ও রয়েছে। যেমন – অফিসে সিনিয়র একজন জুনিয়র কে রেগে বকে দিল। তারপর দেখা গেল যে জুনিয়র যে কাজটা এতক্ষন বা এতদিন করে দেয়নি সেটা সঙ্গে সঙ্গে করে দিল। এটা তো নিশ্চয়ই রাগের ভালো দিক, তাই না?

না, মোটেই নয়। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে একটু সময়ের জন্য তোমার রেগে যাওয়াতে তোমার অফিসের পড়ে থাকা কাজ হয়ে গেলো। কিন্তু, আমার থেকে একটা কথা জেনে নাও যে তুমি যদি যে কোন কারণে মাত্র এক সেকেন্ডের জন্যেও রাগ কর তাহলে পরে পরে সেটা বিভিন্ন দিক দিয়ে বাড়তে থাকবে। আসলে কোন ভাল কারণের জন্যেও তুমি যখন একটুখানি রাগ কর, তোমার মন কিন্তু তখন থেকেই ওই রাগের অনুভূতিটাকে অন্য অনেক জায়গায় অনেক ভাবে আরও অনেক বেশি করে দেখানোর জন্যে তৈরি হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানে ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘Anger Escalation’.

 তার মানে খুব দরকার হলেও এক বাবা তার ছেলেকে, এক শিক্ষক তার ছাত্রকে, এক সিনিয়র তার জুনিয়রকে কক্ষনো রেগে বকবে না?

না, মোটেও নয়।

কিন্তু, হ্যাঁ।

খুব দরকার হলে তুমি রাগ দেখাতে পার শুধুমাত্র একজন দক্ষ অভিনেতার মত – মিথ্যে রাগ। যেটাকে হতে হবে  তোমার নিছক অভিনয়। তার বেশি কিছু না। তখনও কিন্তু তোমার মুখের ওপরের হাসিটা যেন মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকে। 

আর যদি তুমি তা পুরোপুরি ঠিকভাবে করতে পার তাহলে নিশ্চিত জানবে যে তুমি তোমার রাগ বা ক্রোধ কে প্রায় জয় করতে চলেছ।

এখানে পুরনো কথাটা আবার মনে করিয়ে দিই –

‘যা ইচ্ছে তাই কর, কিন্তু কোন কিছুরই আবেশে এসো না।

৫) মন্ত্র বানাও কিম্বা বানানো মন্ত্র উচ্চারণ কর –

ছোট ছোট কয়েকটা সরল শব্দ নাও যার অর্থ যেন খুব ইতিবাচক বা ধনাত্মক হয়। তারপর সেটাকে ২৪ ঘণ্টা মানে দিন রাত জপ করতে থাকো। না না, ঘুমনোর সময় নয়। হ্যাঁ, তবে অভ্যেস হতে হতে ঘুমনো অবস্থায় ও মন্ত্র ঠিক চলতে থাকবে। পরে সেটাই হবে তোমার মন্ত্র মেডিটেশন। মন্ত্র কি হওয়া উচিত তা আমি ‘মেডিটেশন কি’ সেই ব্লগে বলেছি।

একটু এখানেও বলে দিই। যেগুলো কক্ষনও বলবে না সেগুলো হচ্ছে –

‘আমি রাগ করবো না’ ‘রাগ, তুমি যাও’ ‘আমি রাগি না’ এগুলো সব নেতিবাচক। এগুলো বললে তোমার রাগ দিন প্রতিদিন বাড়তে থাকবে।  

যেগুলো মন্ত্র হতে পারে সেগুলো হচ্ছে –

‘আমি শান্ত’ ‘হে দয়াময়’  ‘মন, তুমি শান্ত হও’ এগুলো খুবই ইতিবাচক।

বানানো মন্ত্র শাস্ত্র থেকে পাবে।

‘ওম নমঃ শিবায়’

‘আল্লাহ্‌ হু আকবর’

‘মা রা না থা’ 

মন্ত্র তখন করবে না যখন তুমি কোন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছ যাতে তোমার সম্পূর্ণ মনোযোগ দরকার। যেমন –

কোন প্রজেক্টের গাণিতিক হিসেব

রোগীর পাল্‌স দেখা

ছাত্র কে ভাষা শেখানোর সময় ছাত্রের সাথে কথা বলা

মেশিন চালানো যেখানে দুটো হাতই কাজে লাগছে।

কিন্তু খুব চেনা জানা রাস্তাতে গাড়ি চালানোর সময় মন্ত্র জপ করতে পারো। তবে নতুন রাস্তাতে কক্ষনও নয়।

মন্ত্র জপ তিন প্রকারে করা যায়। বাচিক, ওষ্ঠিক আর মানস। মানস জপকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়। তাই ওটাই করবে। গলার নীচে বিশুদ্ধ চক্র থাকে। ওইখানে নিঃশব্দে মন্ত্র উচ্চরণ করবে। জিব, ঠোঁট আর মুখ একেবারে নড়ে না যেন। একটু অভ্যেস করলেই রপ্ত হয়ে যাবে।

৬) তোমার রাগের একটা ডাইরি লিখবে –

যাতে থাকবে – 

তারিখ      রাগের সময়         রাগ কতক্ষণ ছিল     রাগের কারণ কি ছিল

এই ডাইরি লেখার সময় নিজের প্রতি খুবই সততা দেখাবে কারণ এটা তোমার নিজের জন্যে। অন্য কাউকে দেখানোর জন্যে নয়। যার ওপর রাগ হয়েছে তার নাম ও লিখবে। সে যেই হোক না কেন। ঘুমনোর সময় স্বপ্নের মাঝে যদি রাগ হয় তাহলে ঘুম ভেঙ্গে গেলেই ডাইরিতে লিখবে।  স্বপ্নই যদি ভুলে যাও তাহলে আর কি করা যাবে। ভালো ঘুম হয়েছে মনে করতে হবে। সেটা ভাল।

এতে তুমি তোমার রাগ নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতা বাড়ছে না কমছে স্পষ্ট বুঝতে পারবে।

 ৭) সব সময় বর্তমানে থাকবে –

সকালে বিছানা থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত সব সময় তোমার সমস্ত গতিবিধি আর কার্যকলাপের ওপর বিশেষ মনযোগ দেবে।

আর সেগুলো ঠিক সেই সময় বলতে থাকবে। যেমন –

আমি জেগে গেছি। বিছানা থেকে নামছি। টয়লেট যাচ্ছি। এখন আমি দাঁত ব্রাশ করছি।

আরও সুক্ষ্মভাবে বলতে পারো। যেমন –

আমি টুথব্রাশটা নিচ্ছি। টুথপেস্টের ক্যাপটা খুলছি। ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছি। এবারে দাঁতে – ওপর নীচে ব্রাশ করছি।

যত খুলে বলবে তত তোমার কাজ ধীরে হবে আর সেটা তাড়াতাড়ি ভাল ফল দেবে। আর যদি মনে কর যে অফিস বা কোন কাজে দেরি হয়ে যাবে তাহলে সুক্ষ্মভাবে না বলে মুখ্যগুলো বলবে। কিন্তু ধীরে ধীরে সূক্ষ্মগুলোও প্রাকটিস করবে।

মনের একাগ্রতার জন্যে এটা খুব দরকার।

৮) সকালে ঘুমের পর আর রাতে খাবার পর কিছুক্ষন হাঁটবে –

অন্তত ২০ মিনিট। সবসময় মনে রাখবে তোমার স্বাস্থের উন্নতি ছাড়া এটা কিন্তু ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের জন্যে খুব দরকারি। খুব ধীরে ধীরে হাঁটবে আর চেষ্টা করবে প্রতি চার পদক্ষেপের সাথে নিঃশ্বাস নেওয়ার আর প্রতি চার পদক্ষেপের সাথে নিঃশ্বাস ছাড়ার। আর ওই নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় মন্ত্রটা উচ্চারণ করবে।

সাবধান! এর আগের ব্লগে আমি কিন্তু লিখেছি যে মন্ত্র কেবলমাত্র নিশ্বাস ছাড়ার সময় উচ্চারণ করতে হবে। নেওয়ার সময় মোটেও নয়।   

৯) ভাল এবং যথেষ্ট  ঘুমোবে –

৫০এর নীচে এবং ২৫ এর ওপরে কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা, ৫০ এর ওপরে কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা। কিন্তু তুমি মেডিটেশন করে যদি মনে কর যে এর থেকে কম ঘুম হলে তোমার কোন অসুবিধে হচ্ছে না তাহলে কোন ক্ষতি নেই। আর তুমি যদি মনে কর যে তোমার বেশি ঘুমের দরকার তাহলে নিশ্চয়ই বেশি ঘুমাবে।  ঘুমের কিন্তু ক্ষতিপূরণ হয়। মানে কোন এক দিন যদি ২ ঘণ্টা ঘুম কম হয়ে যায় তাহলে তার পরের দিন ২ ঘণ্টা বেশি ঘুমিয়ে নিলে ক্ষতিপূরণ হয়ে যায়। ডাক্তারি মতে এটাকে ‘sleep debt’ বা ‘sleep deficit’ বলে। তবে এটা যেন সব সময় না হয়। লাগাতার যদি ঘুম কম হতে থাকে তাহলে শরীরের ভীষণ ক্ষতি হবে। স্ট্রেস আর রাগ তো নিশ্চয়ই বাড়বে। তাই ছুটির দিনগুলোতে সব সময় একটু বেশি ঘুমোনর চেষ্টা করবে।

ঘুমনোর আগে এবং ঠিক ঘুম থেকে ওঠার সময় মন্ত্রটা কমপক্ষে ৫ মিনিট নিশ্চয়ই করবে।  

১০)  অষ্টাঙ্গ যোগ মেডিটেশন করবে

তোমার শরীর আর মনের ভেতর থেকে তুমি যদি রাগ বা ক্রোধ কে নির্মূল করতে চাও তাহলে অষ্টাঙ্গ যোগ তোমায় অবশ্যই করতে হবে। এটা আমি আগেও বলেছি। এটা একটা এমন যোগ যেটা তোমার পুরো জীবন বদলে দেবে। ক্রোধ তো কিছুই নয়। এটা তোমায় মানুষ জীবনের সমস্ত দুঃখ কষ্টের বাইরে নিয়ে যাবে। পুরো গ্যারান্টি। কিন্তু শর্ত একটাই থাকবে যে তোমায় কিন্তু এটা পুরোপুরি একদম ঠিকভাবে করতে হবে।

এটা একটা খুব বড় বিষয়। তাই এই ব্লগে পুরোটা বলা যাবে না। কিন্তু আমি গত ব্লগে বলেছিলাম যে সংক্ষেপে বলবো। 

তাহলে এখন এটাতে মন দাও।

অষ্টাঙ্গ যোগ কি?

এটা আসলে ধ্যান বা মেডিটেশনের এমন একটা পদ্ধতি যা তোমার জীবনে সুখ, শান্তি, টাকা পয়সা, সুস্বাস্থ  আর সবকিছু এনে দিতে পারে। এমনকি এটা করতে থাকলে একটা সময় এমনও আসতে পারে যখন নাকি তুমি আগে থেকেই বুঝতে পারবে তোমার সাথে কাল কি হতে পারে।

প্রায় ২২০০/২৩০০ বছর আগে গৌতম বুদ্ধের পরে প্রাচীন ভারতের মহর্ষি পতঞ্জলি এটা সংস্কৃতে লিখেছিল। এবং এটা আসলে পতঞ্জলির ‘যোগ সুত্র’ নামে বিখ্যাত। তারপর ১৮৯৬ সালে স্বামী বিবেকানন্দ এটাকে একটা খুবই অর্থবোধক নতুন নাম দিয়ে লিখেছিল – ‘রাজ যোগ’ এবং লোকে এটাকে অনুসরণও করেছিল। কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক পতন, ঈর্ষা, ঘৃণা, লোভ  আর হিংসা বেড়ে যাওয়াতে বেশিরভাগ লোক আর এটাকে ঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারেনি। আর আজ মানুষের আর্থিক এবং মানসিক স্থিতি এত খারাপ হয়ে যাচ্ছে যে এখন এটার প্রয়োজনীয়তা আবার আরও বেশি করে দেখা দিয়েছে।

মহর্ষি পতঞ্জলি

এই অবস্থায় কিছু লোক ভুল বুঝে একই রকম নামের অন্য বই পড়ে বিভ্রান্ত হচ্ছে।

আমি বলে দিই যে স্বামী বিবেকানন্দের ‘রাজ যোগ’ কিন্তু একটাই। বাজারে আরও হয়তো রাজ যোগ পাবে অন্যদের লেখা। একটু দেখে নেবে।

‘যোগ’ মানে আবার আজকাল বেশীরভাগ লোকই ‘যোগ ব্যায়াম’ বলে বুঝে ফেলে। তাই বর্তমান দিনে দক্ষিন ভারতের একজনের লেখা একটা বই লোকে ভুল বুঝে কিনে ফেলে আর অভ্যেস করতে থাকে – সেটা হল ‘অষ্টাঙ্গ বিন্যাস যোগ’। এরকম আরও অনেক আছে। এগুলো প্রায় সবই আজ থেকে প্রায় ৬০০ বছর আগে লেখা ‘হঠ যোগ’ থেকে নেওয়া। তোমরা কিন্তু মোটেও ভুল করবে না।

কারণ লোকে আজকাল যা কিছু ব্যায়ামের মতো একটু শরীরকে  নড়াচড়া করানোর জন্যে বাজারে আসে তার পেছনে ছোটে। ‘জিম’ বা ব্যায়ামাগার তার একটা বিশেষ উদাহরণ। আমি প্রায় দেখি অনেক যুবক ছেলে মেয়েরা জিদ করে এবং অনেক পয়সা  খরচ করে ‘জিম’ শুরু করে কিন্তু বেশির ভাগই কিছু সময় পরে ছেড়ে দেয়। তাতে লাভের থেকে ক্ষতি বেশি হয়। তবে শরীরের জন্য অল্প ব্যায়াম সব সময় ভাল ফল দেয়। খেলোয়াড়দের জন্য তো নিয়ম অনুসার ব্যায়াম অতি প্রয়োজনীয়।

এবারে যদি বল যে দুটোর মধ্যে পার্থক্য কি? মানে, ‘অষ্টাঙ্গ যোগ’ বা রাজ যোগ আর ‘অষ্টাঙ্গ বিন্যাস যোগ’।

তাহলে বলি যে অষ্টাঙ্গ যোগ হচ্ছে শরীর কে কষ্ট না দিয়ে নিয়মে থেকে মেডিটেশন করে শরীর রক্ষা করা আর জীবনকে পুরোপুরি বদলে ফেলার উপায়।

আর ‘অষ্টাঙ্গ বিন্যাস যোগ’ হচ্ছে শরীর কে কিছু কষ্ট দিয়ে বিভিন্ন মুদ্রাতে শরীরকে রেখে ব্যায়াম করে শরীর কে সুস্থ রাখার চেষ্টা। আমার অভিজ্ঞতায় এর ফল বেশীরভাগ জায়গায় মনোমত হয় না।

অবশ্য এটা তর্কের বিষয় হয়ে যেতে পারে কারণ এখন সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি সংস্থা এটাকে নিয়ে প্রচার করছে। এখন তো ডিগ্রী ডিপ্লোমাও হয়েছে কলেজ ইউনিভারসিটিতে যোগ ব্যায়ামের। বড় শহরগুলোর প্রায় প্রত্যেক স্কুলে ব্যায়ামের শিক্ষক নিযুক্ত হচ্ছে। বাড়ি বাড়ি যোগ ব্যায়ামের শিক্ষক-শিক্ষিকা আসছে হয় ব্যায়াম করিয়ে রোগ সারাতে না হয় শরীর কে সুস্থ রাখতে। অনেকেরই অর্থ উপার্জনের একটা বিশেষ রাস্তা খুলছে। তাই আমি তর্কে যাবো না। আমি  আমার চারদিকে যা দেখছি শুধু তাই বললাম।

যাইহোক, এগুলো খুব সুক্ষভাবে বোঝার কথা। এগুলো আবার ব্যাক্তিগত পছন্দেরও কথা।

আসলে আমরা কিন্তু এখন রাগ বা ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের উপায় শিখছি।  

মহর্ষি পতঞ্জলির ‘অষ্টাঙ্গ যোগ’ এর  আটটি অঙ্গ এই প্রকার –

            ১) যম ২) নিয়ম ৩) আসন ৪) প্রাণায়াম ৫) প্রত্যাহার ৬) ধারণা ৭) ধ্যান ৮) সমাধি

আর এগুলোর কোনটাই শারীরিক ব্যায়ামের সাথে যুক্ত নয় বরং সবগুলোই মানসিক অভ্যেসের সাথে যুক্ত।

যম – পাঁচটি সামাজিক বিষয় অভ্যেস করতে হবে। অহিংসা, সত্য, অস্তেয় (চুরি না করা), ব্রহ্মচর্য (দুটো অর্থ – মন কে ব্রহ্ম বা চরম সত্যের প্রতি নিয়ে যাওয়া এবং সমস্ত ভৌতিক সুখের ওপর সংযম রাখা), অপরিগ্রহ (প্রয়োজনের বেশি সঞ্চয় না করা আর অপরের কিছু দেখে সেটা পাওয়ার ইচ্ছে না করা – আসলে অতি প্রয়োজনের বাইরে কোন কিছুই না চাওয়া)

নিয়ম – পাঁচটি ব্যাক্তিগত বিষয় অভ্যেস করতে হবে। শৌচ (শরীর ও মন শুদ্ধ রাখা), সন্তোষ (যা পাচ্ছ তাতেই সন্তুষ্ট থাকা), তাপস (অধ্যবাসায়, সুখ দুঃখ ইত্যাদিতে আত্মসংযম এবং মানসিক দ্বন্দের সময় নিজেকে স্থির রাখা), সাধ্যায় (নিজের থেকে শাস্ত্র কথা পড়া, আত্মচিন্তা করা, সব কিছু অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখা), ইশ্বর প্রণিধান (পূর্ণ শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সাথে সর্বশক্তিমান ইশ্বরের ওপর নির্ভর করা – শুভ কিংবা অশুভ সবেতেই, আর কেবলমাত্র সৎকর্ম করা)      

আসন – দীর্ঘ সময়ের জন্যবসারএমনযে কোন ভঙ্গী যাতে শরীর এতটুকুও কষ্ট যেন না পায়। দীর্ঘ সময় বসলেও নয়। এটা আসলে মেডিটেশনের সময় ছাড়াও অন্য সময়ে কাজে লাগে। এটা শারীরিক স্থিরতা আনে।

প্রাণায়াম – এবারে যখন বসতে শিখে গেছ তাহলে প্রাণায়ামটা করতে পারবে। প্রাথমিকভাবে এটা শুধু নিঃশ্বাস নেওয়া আর ছাড়া। খুবই ধীরে ধীরে। মেরুদণ্ড একদম সোজা রেখে। আর বিশেষ এটাই যে নিঃশ্বাস নেওয়া আর ছাড়ার সময়কাল সমান হতে হবে। মানে যদি ৪ সেকেন্ডে নাও তাহলে ৪ সেকেন্ডেই ছাড়তে হবে। ভেতরে শ্বাস আটকে রাখবে না। এর পরে আমি আলাদা করে প্রাণায়ামের পুরো পদ্ধতি লিখবো। তাতে – পুরক-কুম্ভক-রেচক বোঝাবো। কিন্তু তুমি যদি শুধু এই প্রাথমিক স্তরের প্রাণায়ামটাই কর তাহলেও সম্পূর্ণ শুভ ফল পাবে। তোমরা বইতে বা ইন্টারনেটে দেখতে পার। কিন্তু ভুল পথে যেও না। অনেকে অনেক রকম প্রাণায়াম বলতে পারে। প্রাণায়ামের লাভ অনেক কিন্তু ভুল হলে ক্ষতি বেশি হতে পারে।

প্রত্যাহার – এটার সরল অর্থ হল ত্যাগ করে দেওয়া। পুরো অর্থ পরে বোঝাবো আলাদা ভাবে। কিন্তু কিসের ত্যাগ?  প্রাথমিকভাবে  দশটা ইন্দ্রিয়ের মধ্যে পাঁচটা জ্ঞানেন্দ্রিয়ের বিশেষ অনুভূতিকে ত্যাগ করা। ওহো! এটাই তো কঠিন হয়ে গেল, তাই না? না, সোজা করে দিচ্ছি। পাঁচটা জ্ঞানেন্দ্রিয় হচ্ছে – চোখ, কান, নাক, জিব, ত্বক। এদের বিশেষ অনুভূতি মানে প্রত্যেকটার ভাল আর খারাপ। ভাল দেখা-খারাপ দেখা, ভাল শোনা-খারাপ শোনা, সুগন্ধ-দুর্গন্ধ, সুস্বাদ-বেস্বাদ, ভাল-খারাপ স্পর্শ। এগুলো সব একই ভাবে দেখতে হবে কিম্বা এদের অনুভূতি একেবারেই ত্যাগ করতে হবে। এখানে শুধু দুটো জিনিষ দিয়ে বোঝাবো যা তোমরা সবাই প্রতিদিন কর। সুগন্ধ আর দুর্গন্ধ নিয়ে তোমরা খুবই উত্তেজনা বোধ কর। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছ – হঠাৎ বলে উঠলে “ইস্‌ কি বাজে গন্ধ!” তুমি দেখাতে চাও যে তোমার ওই রকম গন্ধ ভালো লাগে না। কিন্তু যারা ওই গন্ধের মাঝে রয়েছে তাদের কি? এটাকে বন্দ করতে হবে। তোমার সহনশীলতা এমন হওয়া চাই যে ওতে কিছু যেন পার্থক্য না পড়ে।

সেই একইভাবে অনেকে হোটেলে গিয়ে ঝামেলা করে – এইটা এরকম কেন, মশলা কম, নুন কম, স্বাদ নেই ইত্যাদি। সেই একই কাণ্ড তারা নিজের বাড়িতেও করে। ওরা জিবের স্বাদ পাওয়ার জন্যে ঝগড়া করে। খাবার সরিয়ে দেয়।

এগুলো সব বন্দ করতে হবে। এই অনুভূতি হল ইন্দ্রিয়ের আহার। এটাকে ত্যাগ করতে হবে। বাকিগুলো পরে বলবো। এবং আরও খুলে বলবো।  

ধারণা –  এটা খুব সহজ। তোমার সমস্ত মনকে একটা নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর স্থির করতে হবে। একটা মাত্র বিষয়। অত সোজাও নয়। অনেকে দেখি পূজো পাঠ মন্ত্র কত ধরণের যে করতে থাকে! বন্দ করে একটা বিষয় নিতে হবে।

ধ্যান – এটা তো বলতেই হবে না। সবাই জানো – মেডিটেশন। কিন্তু তাহলে এবার বোঝো যে ওই ওপরের ৬ টা পুরোপুরি অভ্যেস করার পরেই তোমরা ধ্যানে বসার যোগ্য হবে, তাই না? আর সেই জন্যেই গত ব্লগে বলেছিলাম যে সাঁতার তুমি শিখলে না, তা মাঝ নদীতে তোমায় ফেললে হাত পা ছুঁড়ে সাঁতরে কি তুমি পাড়ে আসতে পারবে? তাহলে বুঝতেই পারছ যে মেডিটেশন এর কথা বেশীরভাগ লোকেরা যে ভাবে ছড়াচ্ছে  তা কিন্তু পুরোপুরি ঠিক নয়। নিজেকে তৈরি কর প্রথমে। আজ থেকেই শুরু কর। বেশিদিন লাগবে না।

সমাধি –  এটাকে ‘মোক্ষ’ বলতে পারো। তবে আমি আর একটা বলবো। সেটা কিন্তু একটু আলাদা হবে। সেটা হল ‘প্রাপ্তি’। মোক্ষ চাইলে মোক্ষ। অন্য কিছু চাইলে তাই। তবে যোগের মুখ্য এবং অন্তিম উদ্দেশ্য কিন্তু মোক্ষই। আমি তাহলে অন্যটা কেন বললাম? কারণ তোমরা সবাই জানো যে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে মোক্ষ চাওয়ার লোক খুব কম। তাই বললাম যা চাইবে তা পাবে যখন এই স্থিতিতে আসবে। সময় একটু বেশি লাগতে পারে। তবে ততক্ষনে হয়তো তোমার চাওয়াটা কিন্তু বদলে যেতে পারে। এখন শুরু করার আগে যা কিছু তোমার কাছে খুবই কাম্য বলে মনে হচ্ছে তা হয়তো পরে পরে খুবই অর্থহীন বলে মনে হতে থাকবে।

আজ এই পর্যন্ত। তোমরা ভালভাবে সব কিছু অভ্যেস করবে।

এর পরের ব্লগে আমি দৈনন্দিন জীবনে কিভাবে অষ্টাঙ্গ যোগ অভ্যেস করবে সেটা সরলভাবে বলবো। তোমরা যে পেশাতে যত ব্যস্তই থাক না কেন এটা করা কিন্তু তখন খুব সহজ হবে।

একটা বিশেষ কথা বলি এবার। আমার থেকে ব্যাক্তিগত ভাবে শিখে অনেকেই নিজেকে বদলে ফেলেছে। ক্রোধ, স্ট্রেস সব চলে গেছে এবং কর্মক্ষেত্রে অনেক সুফল পাচ্ছে। তারা বলে যে তারা এখন শান্ত, মনের ওপর নিয়ন্ত্রন পেয়েছে এবং শারীরিক ক্ষমতাও বেড়েছে। অনেকের পরিবারের অনেক গোলযোগ মিটেছে মানে নিজেরা মিটিয়ে ফেলতে পেরেছে।

তোমরা যদি কেউ ব্যক্তিগতভাবে শিখতে চাও তাহলে আমায় হোয়াটসআপ কর। সবার গোপনীয়তা রক্ষা করা আমার প্রথম কর্তব্য।

শান্ত থাক। তোমার মনের একাগ্রতা বাড়ুক।

চারদিকে শান্তি হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *