আমি আমার ‘স্ট্রেস’ বা ‘মানসিক চাপ’ কে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি?
তোমার ইচ্ছে পূরণ করার বা চাহিদা মেটানোর ক্ষমতার অভাবই হচ্ছে তোমার ‘স্ট্রেস’ বা‘ মানসিক চাপ’।

তুমি যদি তোমার মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রন করতে চাও তাহলে সর্বপ্রথম তোমায় জানতে হবে ‘মানসিক চাপ’ টা কি।    

গুগল করলেই বিভিন্ন পরিভাষা অনায়াসে পেয়ে যাবে। অনেকগুলো আবার বুঝতেও কষ্ট হবে।

কিন্তু আমি একদম ছোট এবং সরল করে বলবো যে -

তোমার ইচ্ছে পূরণ করার বা চাহিদা মেটানোর ক্ষমতার অভাবই হচ্ছে তোমার ‘স্ট্রেস’ বা‘ মানসিক চাপ’।

একটু খুলে বলতে হবে, তাই তো?

ধর, কেউ একটা চাকরি চাইছে, খুব দরকার, কিন্তু পাচ্ছে না।  মানেচাকরি পাওয়া তারক্ষমতায় কুলোচ্ছে না – কারণ অনেক কিছুই হতে পারে। হয় ডিগ্রি নেই না হয় মার্কস কম, ইন্টার্ভিউ তে স্মার্টনেস নেই, ওর ইংরেজিটা যেন ইন্টার্ভিউ নেওয়ার লোকেরা ঠিক বুঝতে পারছে না বা তার ঠিক উল্টো টা – আর নাহলে সব শেষে – ঘুষ দেওয়ার পয়সা তার নেই; অল্প কিছু থাকলেও পুরো হচ্ছে না।  

এরকম অবস্থা কিছুদিন ধরে চলতে থাকলে তার মনের অবস্থা খারাপ হতে থাকবে। রাগ হবে। খুব বিরক্তি আসবে। কারোর ভালো কথাও খারাপ লাগতে আরম্ভ করবে। কিছুদিন এগুলো হতে হতে তার মাথার যন্ত্রণা শুরু হবে। ঘুম ভালো হবে না। পেটের রোগ শুরু হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি – শরীর আর মনের ওপর সব খারাপই হতে থাকবে। জ্যোতিষ বলবে – এই গ্রহ-ওই গ্রহ, এই দশা-ওই দশা। পাথর পর, পুজো দাও ইত্যাদি। কিন্তু কিছুতেই কিছু হবে না।

তখন ডাক্তার বলবে যে এটা “স্ট্রেস”।  ওষুধ দেবে, কিন্তু ওষুধ পুরো কাজ কক্ষনও করবে না।  

না-না, আমি নিরুৎসাহিত করছি না মোটেও। আসলে বলতে চাইছি যে কেউ নিজে যদি একটু চেষ্টা না করে স্ট্রেস কম করার তাহলে শুধু ওষুধে কিন্তু কাজ হবে না। সত্যি বলতে কি – একটু মেনে চললে স্ট্রেস হবেই না। ওষুধের কথা উঠবেই না। 

স্ট্রেস এর কারণ গুলো কি? 

কারণঅনেক কিছু হতে পারে। তবে মুখ্য কারণ হচ্ছে তোমার ইচ্ছে পূরণ না হওয়া। মানে, মনে যা চাইছো তা হচ্ছে না আর তাই হয় খুব চিন্তা হচ্ছে নাহলে ভয় কিংবা দুটোই।  

- পরীক্ষা ভালো হল না

- ভালো চাকরি পেলে না

- অফিসের আর বাড়ির কাজের চাপ সামলানো যাচ্ছে না

- তোমার মনে হচ্ছে তুমি বিয়েটা করে ভুল করলে

- বাড়ি বানাতে বা কিনতে পারছো না

- ব্যবসা করতে চাও পয়সা কুলোচ্ছে না

- ব্যাঙ্ক লোণের কিস্তি দিতে পারছো না

- কাউকে কিছু দেবে বলে ফেলেছ কিন্তু জোগাড় হচ্ছে না

- ছেলেকে যে স্কুলে দিয়েছো তোমার এখন মনে হচ্ছে সে স্কুল ভালো নয়

- নিকট আত্মীয় কেউ চলে গেল (অকালে বা জীবন পুরো করে)

- রিলেশন ব্রেক আপ হয়ে গেল (নিজের দোষে বা অন্য কারণে)

- অফিসের পয়সা কিছু খরচ করে ফেলেছি; কি করে ফেরৎ দেব?

এরকম আরও অনেক আছে – বিবাহ বিচ্ছেদ, ভাই-ভাইয়ের ঝগড়া, ভালবাসা না পাওয়া, স্বামী-স্ত্রীর একে অপরকে বুঝতে না চাওয়া বা না পারা, ব্যবসায় লোকসান, অবৈধ সম্পর্ক, ছেলে-মেয়ে কথা শোনে না ইত্যাদি।   

এছাড়া আমার হিসেবে আরও দুটো বড় কারণ হচ্ছে – সবসময় অকারণে ভয় আর অসন্তোষ

তালা তো দিয়েছি কিন্তু যদি কেউ তালা ভেঙ্গে দেয়?

ট্রেন টা ঝাঁকুনি দিচ্ছে কেন? এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে না তো?  

ছেলেটা/মেয়েটা এতক্ষন বাড়ি ফিরল না – কিছু  হয়নি তো?

চাকরি টা করছি বটে কিন্তু কোন লাভ হচ্ছে না। বেতন কম, অফিসটা খুব ছোট…।

ওই লোকটাকে আমি একদম সহ্য করতে পারি না – দেখলেই গা জ্বালা করে …।

এমনকি পাশের বাড়ির লোকটা ভালো আয় করে তা নিয়েও অসন্তোষ আর স্ট্রেস হতে পারে।

আর সকারণে ভয় থেকে যে স্ট্রেস হয় সেটা সাংঘাতিক হতে পারে। তাই যারা সবসময় সততা আর সত্যের পালন করে তাদের কক্ষনও ভয় হয় না।

ইচ্ছে থাকা কি ভুল?

না, মোটেও নয়। কিন্তু এমন ইচ্ছে যেটা পূর্ণ করার ক্ষমতা তোমার আছে তার থেকে যে স্ট্রেস হয় সেটাকে positive stress বা ‘eustress’ বলে। যেমন পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে চাও – তাই স্ট্রেস হল – কিন্তু খুব পরিশ্রম করলে, অনেক ঘণ্টা প্রতিদিন পড়াশুনো করতে থাকলে। আর সব শেষে ভালো নম্বর পেলে। তোমার স্ট্রেস চলে গেল।   

কিন্তু মনে রাখতে হবে যে positive stress বা ‘eustress’ যদি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে তাহলে সেটা খারাপ ‘স্ট্রেস’ (distress) এ পরিণত হয়ে যায়। এবং তার থেকে সেই একই দুষ্পরিনাম হয় যা আগে বলেছি। তাই ইচ্ছে করার আগে যাচাই করে নিতে হবে তোমার ইচ্ছে পূরণের ক্ষমতা আছে কি না।

এই ইচ্ছে গুলো positive stress তৈরি করে আর পূর্ণ হওয়ার পর চলে যায়।

  • সদ্য বিয়ে করার ইচ্ছে
  • জায়গা কেনা বা বাড়ি বানানোর ইচ্ছে
  • সুন্দর জায়গায় বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে
  • নতুন ভালো চাকরি পাওয়ার ইচ্ছে
  • জন্মদিনে ভালো কিছু নেওয়ার বা দেওয়ার ইচ্ছে ইত্যাদি।

‘স্ট্রেস’ থেকে কি কি অসুবিধে হতে পারে? 

ভালো কথা। কিন্তু সেটা জানতে হলে প্রথমে একটু সরল ভাবে এবং ছোট করে জেনে নেওয়া যাক ডাক্তারি মতে ‘স্ট্রেস’ হলে  শরীরের কোন অংশে কি হয়।

যখন কোন সমস্যা আসে – ধর, টাকা ভর্তি পার্সটা হারিয়ে গেছে – তখন সর্বপ্রথম ব্রেন এর একটা অংশ এ্যামিগডালা (amygdala) সেই খবরটা জানতে পারে। জেনে সে খবরটা আরেকটা অংশ হাইপোথ্যালামাস (hypothalamus) কে পাঠিয়ে দেয়। এই হাইপোথ্যালামাস তখন নিজের গ্রুপ এ ওই খবরটা ছড়িয়ে দেয় রিলে রেসের মতো। অদ্ভত ভাবে হাইপোথ্যালামাসের গ্রুপ এ আছে তিনটে অংশ –  একটা হাইপোথ্যালামাস নিজে, তারপর পিটুইটারি  (pituitary gland) আর শেষটা এ্যাড্রেনাল (adrenal glands)। অদ্ভত এইজন্য যে প্রথম দুটো আছে ব্রেনে আর তৃতীয়টা আছে কিডনিতে। অর্থাৎ পুরো শরীর জুড়ে এদের দখল। এদের এই গ্রুপটার নাম হচ্ছে HPA axis এবং সমস্যার খবরটা হরমোন দিয়ে ছড়ানো হয়। হাইপোথ্যালামাস থেকে বেরনো হরমোন corticotropin-releasing hormone (CRH) ছুটে যায় পিটুইটারির কাছে, পিটুইটারি থেকে তখন বেরিয়ে আসে  adrenocorticotropic hormone (ACTH) আর সেটা গিয়ে পৌঁছায় এ্যাড্রেনাল-এ, আর এ্যাড্রেনাল থেকে বেরিয়ে আসে একটা স্টিরয়েড হরমোন কর্টিসল (cortisol) আর এই পুরো ঘটনাটা শরীরকে স্ট্রেস এর সাথে লড়াই করার শক্তি পাইয়ে দেয় যাকে বলা হয় স্ট্রেস রেসপন্স (stress response) আর স্ট্রেস চলে গেলে কর্টিসল লেভেল কম হয়ে যায় এবং শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এটাকে fight-or-flight মানে ‘যুদ্ধ কর কিংবা পালিয়ে যাও’ প্রতিক্রিয়া ও বলা হয়।  যদি শরীর এবং ব্রেন মিলে স্ট্রেস কে কম করতে না পারে তাহলে এই কর্টিসল(cortisol) এবং অন্য হরমোন গুলো আর কমে না। বাড়তেই থাকে। আর এগুলো তখন শরীরের সমস্ত তন্ত্র কে খারাপ ভাবে প্রভাবিত করে দেয় – কংকাল তন্ত্র, শ্বাসতন্ত্র, হৃদয় প্রণালী, পাচন তন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র এবং প্রজনন তন্ত্র – সবটাকে। আর তখনই জন্মাতে থাকে স্ট্রেস জনিত রোগ। অনেক রোগ যা সহজে সারতে পারে বা পারে না। দীর্ঘ সময় ধরে স্ট্রেস থাকলে নীচের রোগগুলো হতে পারে।  

  • পেটের রোগ – যে কোন ধরণের,  
  • মাইগ্রেন –  বিভিন্ন উপসর্গের সাথে,   
  • হৃদয় রোগ – উচ্চ বা নিম্ন রক্ত চাপ, হার্ট এ্যাটাক ইত্যাদি,
  • ডায়াবিটিস – ওষুধ তো চলছে তবুও কখন বেড়ে যাচ্ছে কখন কম,
  • এ্যাজমা – স্বাস কষ্ট এবং অন্য উপসর্গ,  
  • ব্রেনের রোগ – স্মৃতিভ্রংশ হওয়া, কাউকে চিনতে না পারা ইত্যাদি,
  • মানসিক রোগ –  রাগ, বিরক্তি, হিংসা, সব সময় সমালোচনা আর মনমরা হয়ে  থাকা ইত্যাদি,
  • প্রায় সমস্ত ধরণের স্ত্রী এবং পুরুষ রোগ,  
  • হঠাৎ অনেক ওজন বেড়ে বা কমে যাওয়া,
  • তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে যাওয়া,  
  • এই সমস্ত রোগের অনেকগুলো একসাথে হয়ে অকাল মৃত্যু পর্যন্ত হওয়া।  

 ভয় পাওয়ার কথা, তাই না? সত্যিই তাই। স্ট্রেস এমন একটা জিনিস যা আমাদের পুরো জীবন কে নষ্ট করে দিতে পারে।

তাহলে ‘স্ট্রেস’ কিভাবে কম করবো?

হ্যাঁ, সেটাই বলি এবার –

  • আধ্যাত্মিকতার অভ্যেস কর,
  • মেডিটেশন কর, (মনে রাখ যে আধ্যাত্মিকতা ছাড়া মেডিটেশন হয়না – কক্ষনও নয়)
  • সন্তুলিত আহার কর,
  • নিয়মিত ব্যায়াম কর,
  • ভালো করে ঘুমাও ( দিনে বা রাতে – তবে রাতের ঘুমই বেশি ভালো ),
  • টাইম ম্যানেজমেন্ট কর – মানে, কোন সময় কোন কাজ কি ভাবে করবে তা ঠিক কর,   
  • মোবাইল আর টি.ভি. কম দেখ, ল্যাপটপ- ডেস্কটপ শুধু কাজের জন্য ব্যবহার কর,
  • আকাশ কুসুম পরিকল্পনা একদম করো না,
  • বন্ধু কিম্বা পরিবারের সদস্যদের সাথে নিজের মতামত শেয়ার কর,
  • প্রানায়াম কর – না পারলে শবাসন নিশ্চয়ই কর,
  • উপযুক্ত বিশ্রাম নাও,
  • দোষ দেখা বন্দ করে সব কিছুর মধ্যে ভালটা খুঁজে নাও,
  • ‘না’ বলা শেখ – মানে হঠাৎ কোনোকিছু করার জন্যে ‘হ্যাঁ’ করে দিয়ে পরে করতে না পারার স্ট্রেস নিও না,
  • খারাপ বা ঋণাত্মক খবর থেকে দূরে থাকো – টিভি’র খবর সবসময়-ই ঋণাত্মক – রেপ, খুন, মারামারি – এসব থেকে দূরে না থাকলে জীবনে স্ট্রেস যাবে না। 
  • তুমি একাই দেশ বদলে দেবে এই ভাবনা নিয়ে অফিস, চায়ের দোকান, কফি হাউসে সমালোচনা করার থেকে সর্বদা দূরে থাক – অবশ্য তুমি যদি রাজনীতি কর তাহলে শুধু ওই সময় টুকু বলে খান্ত হও যখন তোমার বলার পালা থাকবে,
  • যে জিনিস তোমার ভালো লাগে তা কিছুক্ষন কর – যেমন ভালো গান শোনা, ভালো বই পড়া, ইয়ু টিউব(YouTube) এ বা অন্য কোথাও ভালো প্রেরণাদায়ক অডিও শোনা বা ভিডিও দেখা – শুধু অল্প সময়ের জন্য।

মনে রাখবে এগুলো সব করতে পারলে খুব ভালো কিন্তু ব্যাক্তি বিশেষে সবাই সব কিছু করতে পারে না বা সবসময় সুযোগও হয়ে ওঠে না। তাই আমি বিশেষভাবে শুধু মেডিটেশন করার কথাই বলি।

পিটুইটারি, এড্রেনাল, স্ট্রেস হরমোন – আরও যা কিছু আছে ডাক্তারি মতে সব যদি শুধু মেডিটেশন এ ঠিক হতে পারে তাহলে তা তুমি কেন করবে না সেটা বল দেখি?

আমার কাছে যারাই আসে আমি তাদেরকে এই একটাই কথা বলি। অনেকে উপদেশ পালন করে ওষুধ কমিয়েছে – অনেকে ওষুধ থেকে অব্যাহতিও পেয়েছে।

স্ট্রেস মানুষের আসেই। কোন কোন সময় এমন আসে যখন মনে হয় যে আর বোধহয় কিছু হবে না জীবনে। কিম্বা এই অবস্থা থেকে বেরোনো সম্ভব নয় ইত্যাদি।

কিন্তু আমি বলি যে ওই মনে হওয়াটাই যদি না হয় তাহলে তো ঝামেলা একেবারেই মিটে গেল। স্ট্রেস তো আর হবেই না। আর সেটা শুধু মেডিটেশন করেই সম্ভব।

তাই সবশেষে বলি যে উপরিউক্ত সবগুলো পালন করতে পারলে খুবই ভালো। না হলে মেডিটেশনের সাথে যে কটা পারো সেই কটাই করো।  

একটা বিশেষ কথা -

যারা ইতিপূর্বে স্ট্রেসের ওষুধ শুরু করেছ তারা যেন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ বন্ধ বা কম করো না।

যারা মেডিটেশন করছ তারা করতে থাকো আর যারা ভাবছ কি করি-কি করি তারা এই মুহূর্তে শুরু করার প্রতিজ্ঞা নাও।

ভালো থাকো, সুস্থ থাকো। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *